যান্ত্রিক পদ্ধতির প্রয়োগ বলতে কী বুঝায়?

Table of Contents

উদ্দীপকঃ-

=> শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও স্থানান্তর এ তিনটি বিষয়ই একটি যুগান্তকারী ঘটনার প্রভাব। এই যুগান্তকারী ঘটনা মানব সভ্যতাকে সরাসরি সীমারেখা টেনে দুটো ভাগে বিভক্ত করেছে। এ ঘটনা একটি নির্দিষ্ট সময়ে সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘসময়ব্যাপী সামাজিক পরিবর্তন এনে উৎপাদন ব্যবস্থা, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং সার্বিক চিন্তাধারায় আমূল পরিবর্তন আনে। এ পরিবর্তন মানুষকে বেগের মধ্যে রেখে আবেগ কেড়ে দিয়েছে। ফলেই মানব জীবনে এ পরিবর্তন অবিমিশ্র আশির্বাদ নয়।

ক. কে “শিল্পবিপ্লব” প্রত্যয়টির নামকরণ করেছিলেন?

খ. যান্ত্রিক পদ্ধতির প্রয়োগ বলতে কী বুঝায়?

গ. উদ্দীপকের যুগান্তকারী ঘটনা কোন বিষয়টিকে নির্দেশ করে? ব্যাখ্যা কর।

ঘ. মানব জীবনে এ পরিবর্তন অবিমিশ্র আশীর্বাদ নয়-উদ্দীপকের এ উক্তিটির সাথে তুমি কি একমত? বিশ্লেষণ কর।

 

প্রশ্নের উত্তরঃ-

ক) আরনল্ড জে টয়েনবি শিল্প বিপ্লব প্রত্যয়টির নামকরণ করেন।

 

খ) যান্ত্রিক পদ্ধতির প্রয়োগ বলতে উৎপাদন ব্যবস্থায় যন্ত্রের ব্যবহারকে বোঝায়।

অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে ইংল্যান্ডে এবং পরবর্তীতে অন্যান্য দেশে কৃষিভিত্তিক হস্তনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থায় যন্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়। একেই যান্ত্রিক পদ্ধতির প্রয়োগ বলা হয়। যান্ত্রিক পদ্ধতির প্রয়োগের ফলে সমাজের সর্বক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।

 

গ) উদ্দীপকের যুগান্তকারী ঘটনা শিল্প বিপ্লবকে নির্দেশ করে।

শিল্প বিপ্লব হচ্ছে কৃষিভিত্তিক, হস্তশিল্পনির্ভর ক্ষুদ্রায়তন উৎপাদন ও অর্থনীতি থেকে শিল্প ও যন্ত্রচালিত বৃহদায়তন উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া। এটি অষ্টাদশ শতকে ইংল্যান্ডে শুরু হয় এবং সেখান থেকে বিশ্বের অন্যান্য অংশে বিস্তার লাভ করে। এর ফলে যোগাযোগ, বিজ্ঞান-প্রযুক্তিসহ সমাজের সকল ক্ষেত্রে উন্নয়নের উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিকসহ সকল ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করে। শিল্প বিপ্লবের ফলে বিশ্বে ব্যাপক হারে শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও শহরমুখী নগরের মানুষের জনস্রোত শুরু হয়। উদ্দীপকে এই বিষয়টিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।উদ্দীপকে একটি বিষয় সম্পর্কে বলা হয়েছে যার একটি নির্দিষ্ট সময়ে সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থা অর্থনীতি, রাজনীতি সংস্কৃতিসহ সর্বক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। এর প্রভাবে শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও স্থানান্তর শুরু হয়। উদ্দীপকে বর্ণিত এই বিষয়টি উপরে বর্ণিত শিল্পবিপ্লবের সাথেই সাদৃশ্যপূর্ণ। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের যুগান্তকারী ঘটনাটি শিল্প বিপ্লব।

 

ঘ) মানবজীবনে এ পরিবর্তন অর্থাৎ শিল্পবিপ্লবের ফলে সমাজের সর্বক্ষেত্রে যে পরিবর্তন সাধিত হয় তা অবিমিশ্র আশীর্বাদ নয়- এ উক্তিটির সাথে আমি একমত।

শিল্পবিপ্লব এমন একটি পরিবর্তন প্রক্রিয়া, যা উৎপাদন ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে এনেছে পরিবর্তন। এ পরিবর্তন যেমন ইতিবাচক, পাশাপাশি সমাজে বেশকিছু ক্ষতিকর প্রভাব বয়ে এনেছে। শিল্পবিপ্লবের ফলে উৎপাদন ক্ষেত্রে একদিকে গতিশীলতা সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি বেকারত্বের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ যন্ত্রচালিত উৎপাদনে শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা কমে যাওয়ায় ছদ্মবেশী বেকারত্বের সৃষ্টি হয়েছে। এটি একদিকে মানুষের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিলেও মানুষের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিকতার জন্ম দিয়েছে। শিল্পবিপ্লবের ফল হিসেবে সৃষ্টি হওয়া নগরায়ণ মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করেছে। পারিবারিক ভাঙন, বস্তি সমস্যা, মাদকাসক্তি, দাম্পত্য কলহ এগুলো সবই শিল্পবিপ্লবের নেতিবাচক প্রভাব। তাছাড়া কর্মক্ষেত্রে শ্রমিক অসন্তোষ, শিল্প দুর্ঘটনা প্রভৃতি সমস্যাও শিল্পবিপ্লবের ফলে সৃষ্টি হয়েছে।উদ্দীপকেও বলা হয়েছে যে শিল্পবিপ্লব সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থা, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতিসহ সার্বিক চিন্তাধারায় আমূল পরিবর্তন আনলেও এ পরিবর্তন মানুষের আবেগ কেড়ে নিয়েছে। এতে বোঝা যায় শিল্প বিপ্লবের ফলে সমাজে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের প্রভাবই পড়েছে।

উপরের আলোচনা থেকে বলতে পারি, উদ্দীপকে ইঙ্গিতকৃত ঘটনা শিল্পবিপ্লব মানবজীবনে অবিমিশ্র আশীর্বাদ নয়।

 

উদ্দীপকঃ-

=> ১৯৪১ সাল, সংঘটিত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এর প্রভাবে ভেঙ্গে পড়ে ‘ক’ দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা। সৃষ্টি হয় নতুন নতুন সমস্যার। ফলে ‘ক’ দেশের সমাজসেবা কর্মসূচির আমূল সংস্কার সাধন জরুরী হয়ে পড়ে। এরই প্রেক্ষিতে ১৯৪২ সাল উক্ত দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অভাব ও দারিদ্র্য হতে ‘ক’ দেশের জীবনকে মুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৪২ সালে একটি রিপোর্ট পেশ করা হয় যেখানে জনগণের অগ্রগতির পাঁচটি অন্তরায়ের কথা বিশেষ নামে ব্যবহার করা হয়েছে। পরবর্তীতে এ রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই ‘ক’ দেশ কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করে এবং উক্ত দেশের সামাজিক নিরাপত্তার মূল কাঠামো গড়ে উঠেছে।

পঞ্চদৈত্য ও সামাজিক নীতি কী?

 

ক. ১৯০৫ সালের দরিদ্র আইন কমিশনের সভাপতি কে ছিলেন?

খ. “ইংল্যান্ডে দরিদ্র হয়ে জন্ম নেয়াটা পাপ” – বুঝিয়ে বল।

গ. উদ্দীপকে পাঁচটি অন্তরায়ের কথা যে বিশেষ নামে ব্যবহার করা হয়েছে তা ব্যাখ্যা কর।

ঘ. উদ্দীপকের ‘রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই ‘ক’ দেশ কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করে এবং উক্ত দেশের সামাজিক নিরাপত্তা মূল কাঠামো গড়ে উঠেছে’-একমত থাকলে উক্তিটি বিশ্লেষণ কর।

 

প্রশ্নের উত্তরঃ-

ক) ১৯০৫ সালের দরিদ্র আইন কমিশনের সভাপতি ছিলেন লর্ড জর্জ হ্যামিল্টন।

দরিদ্র আইন কমিশন কি?

খ) প্রাক শিল্প যুগে ইংল্যান্ড বিভিন্ন ধরনের আর্থ সামাজিক সমস্যা ও দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত ছিল। এ সময় সরকার বিভিন্ন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।কিন্তু এসব আইনের বেশির ভাগই ছিল দরিদ্রের জন্য শাস্তি ও দমনমূলক। ফলে এক পর্যায়ে এই আইনগুলো দরিদ্রদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এগুলোর মাধ্যমে তারা নির্যাতিত, নিপীড়িত হতে থাকে। একদিকে দারিদ্র্য আর অন্যদিকে নিপীড়নমূলক আইন দরিদ্রদের জীবনকে অতীষ্ট করে তোলে। এজন্য প্রাক শিল্পযুগে ইংল্যান্ডে দরিদ্র হয়ে জন্ম নেওয়াকে পাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

 

গ) উদ্দীপকে ইঙ্গিতকৃত পাঁচটি অন্তরায়ের কথা যে বিশেষ নামে ব্যবহার করা হয়েছে তা হলো পঞ্চদৈত্য।

ইংল্যান্ডের সমাজকে দারিদ্র্যমুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে স্যার উইলিয়াম বিভারিজ ১৯৪২ সালে তার প্রতিবেদনে ইংল্যান্ডের উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী প্রধান পাঁচটি নিয়ামককে ‘পঞ্চদৈত্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। বিভারিজ রিপোর্টে উল্লিখিত পঞ্চদৈত্য হলো- অভাব, রোগ, অজ্ঞতা, মলিনতা ও অলসতা। বিভারিজ রিপোর্টে উল্লিখিত পাঁচটি অন্তরায় শুধু ইংল্যান্ডের সামাজিক অগ্রগতিতে দুষ্টচক্রের মতো বাঁধার সৃষ্টি করেছিল তা নয় বরং সমগ্র বিশ্বের সমাজব্যবস্থাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। অভাবযুক্ত ইংল্যান্ডের সমাজজীবনকে যে দৈন্যতা অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে রেখেছে অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম বিভারিজ তাদেরকে মানবসমাজের অগ্রগতির প্রধান অন্তরায় ও প্রতিবন্ধকতার কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন। উদ্দীপকে এই বিষয়টিকেই নির্দেশ করা হয়েছে।উদ্দীপকে বলা হয়েছে অভাব ও দারিদ্র্য থেকে ‘ক’ দেশের সমাজজীবনকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ১৯৪২ সালে একটি রিপোর্টে পেশ করা হয় যেখানে জনগণের অগ্রগতির পাঁচটি অন্তরায়ের কথা বিশেষ নামে ব্যবহার করা হয়েছে। উদ্দীপকের এই প্রতিবেদনটি পাঠ্যবইয়ের বিভারিজ রিপোর্টের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। আর বিভারিজ রিপোর্ট ইংল্যান্ডের উন্নয়নের অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত পাঁচটি নিয়ামককে ‘পঞ্চদৈত্য’ নামে আখ্যায়িত করা হয়েছিল।

 

ঘ) উদ্দীপকের ইঙ্গিতকৃত বিভারিজ রিপোর্ট এর উপর ভিত্তি করেই ‘ক’ দেশ অর্থাৎ ইংল্যান্ড কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করে এবং উক্ত দেশের সামাজিক নিরাপত্তার মূল কাঠামো গড়ে উঠে – উক্তিটির সাথে আমি একমত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ইংল্যান্ডে আর্থ-সামাজিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এ সমস্যা মোকাবিলার লক্ষ্যে তৎকালীন সরকার স্যার উইলিয়াম বিভারিজকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করে। সার্বিক বিশ্লেষণে এ কমিটি ১৯৪২ সালে সরকারের কাছে একটি প্রতিবেদন পেশ কর, যা বিভারিজ রিপোর্ট নামে পরিচিত। এই রিপোর্টের ভিত্তিতে ১৯৪২ সালে ইংল্যান্ডের সামাজিক নিরাপত্তায় সামাজিক বিমা, পারিবারিক ভাতা, শ্রমিক ক্ষতিপূরণ বা শিল্প দুর্ঘটনা বিমা, সরকারি সাহায্য, জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি প্রভৃতি প্রণয়ন করা হয়। এসব কর্মসূচির আওতায় স্বাস্থ্য, বার্ধক্য ও পঙ্গু বিমা; শিশু জন্ম- মৃত্যুর জন্য বিশেষ ভাতা, পরিবারে দুইয়ের অধিক ১৮ বছরের কমবয়সী সন্তানের জন্য ভাতা, শিল্প দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের ক্ষতিপূরণ, দরিদ্রদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি কাজের ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। এভাবে বিভারিজ রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রণীত কর্মসূচিগুলো জনগণের কল্যাণ সাধনে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।উদ্দীপকে বলা হয়েছে ‘ক’ দেশের সমাজজীবনকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে ১৯৪২ সালে জনগণের অগ্রগতির অন্তরায় হিসেবে পাঁচটি নিয়ামককে চিহ্নিত করা হয়েছে যা ১৯৪২ সালে ইংল্যান্ডের দারিদ্র্য দূরীকরণে প্রণীত বিভারিজ রিপোর্টকে নির্দেশ করছে। আর এ রিপোর্টের ভিত্তিতে উপরোল্লিখিতভাবে ইংল্যান্ডে সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠেছিল।সুতরাং উপরের আলোচনা বিশ্লেষণপূর্বক বলা যায়, বিভারিজ রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই ইংল্যান্ড কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের মর্যাদায় উন্নীত হয় এবং দেশে সামাজিক নিরাপত্তার মূলভিত্তি স্থাপিত হয়।