বিলাসী গল্পের নামকরণের সার্থকতা

বিলাসী গল্পের নামকরণের সার্থকতাঃ-

শৈল্পিক দিক বিবেচনায় সাহিত্যের নামকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নামকরণ ছাড়া কোনো সাহিত্যবিষয়ক রচনাই পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। অর্থপূর্ণ একটি শিরোনাম গল্পের বিষয়বস্তুকে পাঠকের কাছে স্পষ্ট করে তোলে। কালজয়ী কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘বিলাসী’ গল্পের নামকরণ করেছেন কাহিনির মূল চরিত্র বিলাসীর নামানুসারে। সাপুড়েকন্যা বিলাসীর জীবনের করুণ পরিণতি, সমাজের ভণ্ডামি, শঠতা ও হৃদয়হীনতাই ‘বিলাসী’ গল্পের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিলাসী কর্মনিপুণ, বুদ্ধিমতী ও সেবাব্রতী। সে সেবা দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে মৃত্যুঞ্জয়কে বাঁচিয়ে তুলে শেষ পর্যন্ত প্রেমের জন্য নির্দ্বিধায় বেছে নিয়েছে স্বেচ্ছামৃত্যু। কাজেই বিলাসীর, জীবনের করুণ কাহিনি অবলম্বনে যেহেতু গল্পটি সৃষ্টি হয়েছে, তাই গল্পকার গল্পের নামকরণ করেছেন ‘বিলাসী’।বিলাসী গল্পের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র আবর্তিত হয়েছে প্রধান চরিত্র বিলাসীকে কেন্দ্র করে। বিলাসী মৃত্যুঞ্জয়কে ভালোবেসেছে, সেবা-শুশ্রুষা দিয়ে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছে। প্রতিদানে মৃত্যুঞ্জয়ও তাকে ভালোবেসে স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু স্বার্থান্ধ-সংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ তা মেনে নিতে পারেনি। পরিশেষে তাদের জীবনে নেমে এসেছে করুণ পরিণতি; মৃত্যুই সেই জীবননাট্যের শেষ দৃশ্য। মূলত বিলাসী এমনই, একজন প্রেমময়ী নারী, যে প্রেমের জন্য নির্দ্বিধায় বেছে নিয়েছে মৃত্যুকে; আর তার প্রেমের মহিমার আলোয় ধরা পড়েছে সমাজের অনুদারতা ও রক্ষণশীলতা এবং সমাজজীবনের নিষ্ঠুরতম অশুভ চেহারা। গল্পটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত কিছুর কেন্দ্রবিন্দু বিলাসী। তাই বলা যায়, গল্পটির নামকরণ ‘বিলাসী’ অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত, সার্থক ও শিল্পসম্মত হয়েছে।

বিলাসী গল্পের নামকরণের সার্থকতা

বিলাসী রচনার বক্তব্যবিষয়ঃ-

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬-১৯৩৮) বাংলা সাহিত্যে অপরাজেয় কথাশিল্পী হিসেবে খ্যাত। জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ও বিচিত্র সব মানুষের চরিত্র তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর বহু ছোটগল্পে। ‘বিলাসী’ শরৎচন্দ্রের এরকমই একটি ছোটগল্প। ‘ন্যাড়া’ নামের এক যুবকের জবানিতে ‘বিলাসী’ গল্পটি বিবৃত হয়েছে। মূলত ন্যাড়া চরিত্রে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ছেলেবেলার ছায়াপাত ঘটেছে। ‘বিলাসী’ গল্পে বর্ণিত হয়েছে দুই ব্যতিক্রমধর্মী মানব-মানবীর প্রেমের মহিমা, যা ছাপিয়ে উঠেছে জাতিগত বিভেদের সংকীর্ণ সীমা। গল্পে চিত্রিত হয়েছে অশিক্ষা, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, অনুদার মনোবৃত্তি, পরনিন্দা, বৈষম্যমূলক আচার-আচরণ, দুর্বলের প্রতি সবলের নির্যাতন অর্থাৎ তৎকালীন হিন্দু সমাজের বীভৎস রূপ। ‘বিলাসী’ গল্পে এসব বিষয় চমৎকারভাবে জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে।বিলাসী গল্পের ঘটনা আবর্তিত হয়েছে প্রধান নারী চরিত্র কর্মনিপুণ, বুদ্ধিমতী ও সেবাব্রতী বিলাসী এবং কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্র উদার, নির্ভীক, দৃঢ়চেতা, ধৈর্যশীল ও প্রণয়নিষ্ঠ মৃত্যুঞ্জয়কে কেন্দ্র করে। মৃত্যুঞ্জয় ছিল অনাথ এক যুবক। এক জ্ঞাতি খুড়া ছাড়া আপনজন বলতে তার অন্য কেউ ছিল না। তার বিরাট একটি আম-কাঁঠালের বাগান ছিল। জ্ঞাতি খুড়াও নিজেকে সেই বাগানের অর্ধেক অংশীদার বলে প্রচার করেন এবং মৃত্যুঞ্জয়ের নামে নানা ধরনের দুর্নাম রটান। মৃত্যুঞ্জয় ছিল উদার প্রকৃতির। তার উদারতার সুযোগ নিয়ে স্কুলের অনেক ছেলে নানা কারণ দেখিয়ে টাকা-পয়সা চেয়ে নিত। কিন্তু সামাজিক দুর্নামের ভয়ে প্রকাশ্যে তার সঙ্গে কেউ কথা পর্যন্ত বলত না। মৃত্যুঞ্জয় একবার কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়লে তাকে মৃত্যুর কবল থেকে রক্ষা করে মালোপাড়ার সাপুড়েকন্যা বিলাসী। সেবাব্রতী বিলাসী শরৎচন্দ্রের উজ্জ্বল নায়িকাদের মতোই এক প্রেমময়ী নারী। অসীম ধৈর্য ও সাহসিকতার সঙ্গে বিলাসী তার সেবা-যত্ন দিয়ে মৃত্যুঞ্জয়কে সারিয়ে তুলেছে।মৃত্যুঞ্জয় সেরে উঠেছে ঠিকই, কিন্তু সমাজ তাকে অন্নপাপের অপবাদে অভিযুক্ত করেছে। কারণ সে নিচু জাতের মেয়ে বিলাসীর হাতে খাদ্য গ্রহণ করেছে। উচ্চ বর্ণীয় হিন্দু সমাজের চোখে এটি যে এক মহাপাপ! এই অভিযোগকে পাত্তা না দিয়ে মৃত্যুঞ্জয় বিলাসীকে বিয়ে করে এবং জাত-কুলের মূলে কুঠারাঘাত করে পৈতৃক ভিটা ছেড়ে মালোপাড়ায় নতুন বসতি গড়ে।সে সাপুড়ে পেশাকেই জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু বিলাসী মৃত্যুঞ্জয়কে এই পেশা ত্যাগ করার জন্য বারবার অনুরোধ জানিয়েছে। কারণ সে জানে সাপ ধরার বিদ্যা একধরনের ধোঁকাবাজি। শেষ পর্যন্ত একদিন সাপের দংশনেই মৃত্যুর কোলে • ঢলে পড়ল মৃত্যুঞ্জয়। দৈহিকভাবে তার মৃত্যু হলেও প্রেমের মধ্য দিয়ে সে মৃত্যুকে জয় করেছে এবং প্রেমকে দিয়েছে মহিমার গৌরব। অন্যদিকে বিলাসী স্বামীর মৃত্যুর শোক সইতে না পেরে সপ্তাহান্তেই বিষপানে আত্মহত্যা করে।মৃত্যুঞ্জয় ও বিলাসীর পরস্পরের প্রতি নিখাদ ভালোবাসাই গল্পের মূল বিষয়। কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রেমহীন অমানবিক নিষ্ঠুর সমাজেও মৃত্যুঞ্জয় ও বিলাসী তাদের একনিষ্ঠ প্রেমের বন্ধনে প্রেমকে করেছে মহিমান্বিত 1

বিলাসী গল্পের পাঠ বিশ্লেষণঃ-

“কিন্তু শহরের সুখ-সুবিধা রুচি লইয়া আর তাদের গ্রামে ফিরিয়া আসা চলে না।”

আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, নাগরিক রুচি ও চিন্তা-চেতনার উৎকর্ষের পরিবেশ ছেড়ে শহরবাসী লোকজন পাড়াগাঁয়ে গিয়ে থাকতে চায় না। কারণ গ্রামের কাদা-জল, ধুলো- বালি, নানা কুসংস্কার ও স্বার্থপর মানসিকতা এখন তাদের পছন্দ নয়। কিন্তু শিক্ষিত ও রুচিশীল শহুরে মানুষ গ্রামের সংস্পর্শে এলে গ্রাম এলাকা উন্নত হতো অনায়াসেই। গ্রাম থেকে শহরবাসী হওয়া মানুষের গ্রামের প্রতি উপেক্ষা ও অবহেলার কথাই আক্ষেপ আকারে প্রতিফলিত হয়েছে এই অংশে।

“অবশ্য দখল একদিন তিনি পাইয়াছিলেন বটে, কিন্তু সে জেলা- আদালতে নালিশ করিয়া নয়- ওপরের আদালতের হুকুমে।”

লোভ ও স্বার্থপরতা মানুষকে বিবেকহীন করে দেয়। মানুষ তখন যা ইচ্ছে তাই করে বেড়ায়। এমনকি সম্পত্তি দখলের লোভে আদালতে নালিশ করার মিথ্যা হুমকি দেয়। এরকম ন্যক্কারজনক ও জবরদস্তিমূলক কাজ করেছেন আলোচ্য গল্পের নায়ক মৃত্যুঞ্জয়ের জ্ঞাতি খুড়া। মৃত্যুঞ্জয়ের বিরুদ্ধে প্রতিদিন নানা ধরনের দুর্নাম রটানোই ছিল তার কাজ। আর বলে বেড়ান যে ওই বাগানের অর্ধেকটা তার। কিন্তু মৃত্যুঞ্জয়ের ঘোর অসুস্থতার সময় তার টিকিটিরও খোঁজ পাওয়া যায়নি। মৃত্যুঞ্জয় বেঁচে থাকতে তিনি এই বিশাল বাগানবাড়ির দখল নিতে পারেননি। ওপরের আদালতের হুকুমে অর্থাৎ মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যুর পর খুড়া তার অন্যায় ইচ্ছা পূরণ করতে পেরেছিলেন। আলোচ্য কথাটির মধ্য দিয়ে খুড়ার প্রতি লেখকের শ্লেষ ও ঘৃণার প্রকাশ ঘটেছে।

 

“এ কথাও কোনো বাপ ভদ্র সমাজে কবুল করিতে চাহিত না- গ্রামের মধ্যে মৃত্যুঞ্জয়ের ছিল এমনি সুনাম।”

কথাটিকে আপাতদৃষ্টিতে নেতিবাচক মনে হলেও এটির মধ্যে লুকিয়ে আছে মৃত্যুঞ্জয়ের প্রতি সুনাম ও প্রশংসা। কেননা মৃত্যুঞ্জয়ের খাওয়া-পরার কোনো অভাব ছিল না। গ্রামের ছেলেরা আবদার করলে সে দোকানের খাবার কিনে খাওয়াত। অনেক ছেলের বাবা গোপনে ছেলেকে দিয়ে বই চুরি হয়ে যাওয়া বা বেতন হারানোর কথা বলে টাকা আদায় করত। কিন্তু ঋণ স্বীকার করা তো দূরের কথা, মৃত্যুঞ্জয়কে তারা না চেনার ভান করত। গ্রামের মানুষের এই ঘৃণ্য মানসিকতার প্রতি শ্লেষ প্রকাশ করতে গিয়ে লেখক ‘সুনাম’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

 

“তাহার বয়স আঠারো কি আটাশ ঠাহর করিতে পারিলাম না।”

দুশ্চিন্তা, নির্ঘুম রাত কাটানো, অবিরাম কাজ করা, মৃত্যুঞ্জয়ের সেবা-যত্ন করা- একনাগাড়ে দীর্ঘদিন এভাবে চলার কারণে বিলাসীর চোখ-মুখ ও অবয়বে ক্লান্তির ছাপ পড়ে। তার শরীর শুকিয়ে যায়, চেহারা দেখে বয়সী ও বিধ্বস্ত মনে হয়। ন্যাড়া এক সন্ধ্যার অন্ধকারে লুকিয়ে অসুস্থ বন্ধু মৃত্যুঞ্জয়কে দেখতে এসে সাপুড়েকন্যা বিলাসীকে দেখে তার বয়স বুঝতে পারেনি। ন্যাড়ার মনে হয়েছিল তার বয়স আটাশ। মৃত্যুঞ্জয়ের কঙ্কালসার দেহের দিকে তাকিয়ে তার মনে হয়েছিল যমরাজ শেষ পর্যন্ত সুবিধা করে উঠতে পারেননি কেবল ঐ মেয়েটির সেবা- শুশ্রুষার জন্যে। খেটে খেটে আর রাত জেগে জেগে তার শরীরে আর কিছুই নেই। বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে বিলাসীর জন্য সহানুভূতি আর সহমর্মিতা ঝরে পড়েছে ন্যাড়ার কণ্ঠে।

“আমরা বলি যাহারই গায়ে জোর নাই, তাহারই গায়ে হাত তুলিতে পারা যায়।”

আর্থিক ও শারীরিক শক্তিতে দুর্বল এমন মানুষকেই আমরা দুর্বল বলি। যুগ যুগ ধরে সবল ও প্রভাবশালীরা দুর্বলদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন করে আসছে। সমাজের নারীরাও দুর্বল শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। তারাও পুরুষের হাতে নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত। ইংল্যান্ডে একটি কুসংস্কার আছে, স্ত্রীলোক দুর্বল ও নিরুপায় বলে তাদের গায়ে হাত তুলতে নেই। কিন্তু আমাদের দেশে ঘটে এর উল্টোটা, যেন সব দোষ নারীর। বিলাসীর সেবা-যত্নে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা মৃত্যুঞ্জয় নিজে অগ্রণী হয়ে তাকে বিয়ে করে। কিন্তু স্বার্থপর খুড়া গ্রাম্য কুসংস্কারের দোহাই দিয়ে দশ-বারোজনকে সঙ্গে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন বিলাসীর ওপর। তাকে টেনেহিঁচড়ে গ্রামের বাইরে রেখে আসেন। বিলাসী প্রতিবাদ করে এবং কান্নাকাটি করেও তাদের রুখতে পারেনি। কারণ সে সব দিক থেকেই ছিল দুর্বল, তাই তার গায়ে হাত তোলাটা ছিল খুব সহজ। অথচ এটি মানুষের জন্য ন্যক্কারজনক পরিচয়।

“ভাত খাওয়া যে অন্ন-পাপ। সে তো আর সত্য সত্যই মাপ করা যায় না।”

‘অন্নপাপ’ বলে কোনো পাপ নেই। এটি একটি কুসংস্কার। স্বার্থপর সমাজপতিরা প্রভাব-প্রতিপত্তি বজায় রাখার জন্য শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে নিজেদের সুবিধামতো নিয়ম করে নিয়েছে। নিচু জাতের হাতে ভাত খাওয়া যে অন্নপাপ- একথা মেনে নিয়েছে সমাজের নিরক্ষর, অসচেতন ও দুর্বল মানুষ। এটিও শোষণের একটি প্রক্রিয়া। বিলাসীর হাতে ভাত খেয়ে কোনো অন্যায় করেনি- এটি মৃত্যুঞ্জয় মানে। সে জানে, সমাজের ধুরন্ধর মানুষ কেবল নিতে জানে, দুঃসময়ে এগিয়ে আসে না। লুচি, সন্দেশ, পাঁঠার মাংস যার হাতে খাওয়া যায়, তার হাতে ভাত খাওয়া যাবে না কেন? এ প্রশ্নের উত্তর সমাজপতিদের কাছে নেই। অথচ মৃত্যুঞ্জয়ের খুড়ার মতো লোভী সমাজপতিরা ‘ভাত খাওয়া অন্নপাপ’ এই ছুতোয় মৃত্যুঞ্জয় ও বিলাসীকে গ্রামছাড়া করেছে। কারণ অন্নপাপ তো সত্য সত্যই মাফ করা যায় না।

 

“আমাদের তো খাবার ভাবনা নেই, আমরা কেন মিছামিছি লোক ঠকাতে যাই।”

মানুষের চাহিদা সীমিত হলে, অতিরিক্ত চাহিদার আকাঙ্ক্ষা থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে একটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠিত হতো অনায়াসেই। কিন্তু প্রকৃত সত্য এই যে, অধিকাংশ মানুষের অভাব আর চাহিদার শেষ নেই। কিছু সংখ্যক মানুষ নিজেদের সীমিত চাহিদার মধ্যে সন্তুষ্ট থাকে। এই সন্তুষ্টিটাই বড় কথা। কারণ অর্থ-সম্পদের লোভ বেশি হলে সন্তুষ্টি থাকে না। বিলাসীর মধ্যে সন্তুষ্টি ছিল। কিন্তু মৃতুঞ্জয়ের সন্তুষ্টি ছিল না। সাপুড়েরা কীভাবে মানুষকে ঠকিয়ে শিকড় বিক্রি করে, সাপের মুখে গরম লোহার শিকের ছ্যাঁকা দিয়ে খেলা দেখায়- এটি দুজনেই জানত এবং এর পরিণতিও জানত। বস্তুত তাদের তো খাওয়ার ভাবনা বা কিছুর অভাব ছিল না। তাই মৃত্যুঞ্জয়ের প্রতি বিলাসীর অনুরোধ ছিল- ‘আমাদের তো খাবার ভাবনা নেই, আমরা কেন মিছামিছি লোক ঠকাতে যাই।’

“সাপ একটা নয় একজোড়া তো আছে বটেই হয়ত বা বেশি, থাকিতে পারে।”

অভিজ্ঞতার মূল্য সব সময়ই থাকে। তার সঙ্গে যদি থাকে সতর্ক দৃষ্টি ও সচেতনতা তাহলে সবকিছু বাস্তবতার নিরিখে বিবেচনা করা যায়। বিলাসী ছিল ওস্তাদ সাপুড়ের মেয়ে। বাবার সঙ্গে সঙ্গে থেকে সে নানা বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল। তাই মৃত্যুঞ্জয় ও ন্যাড়া কোথাও সাপ ধরতে গেলে সেও সঙ্গে যেত। একবার ক্রোশ দেড়েক দূরে এক গোয়ালার বাড়িতে সাপ ধরতে গিয়ে মেটে ঘরের মেঝে খানিকটা খুঁড়তেই একটি গর্তের চিহ্ন পাওয়া যায়। কিন্তু কেউ লক্ষ না করলেও বিলাসী হেঁট হয়ে কয়েক টুকরা কাগজ দেখে তা হাতে তুলে নিয়ে পরীক্ষা করে সতর্ক করে দেয়- ‘সাপ একটা নয় একজোড়া তো বটেই হয়ত বা বেশি থাকিতে পারে।’

 

“তখন ভইরূপ কোনো একটা নরকে যাওয়ার প্রস্তাবে পিছাইয়া দাঁড়াইব না, এইমাত্র বলিতে পারি।”

ভালোবাসার জন্য জীবন দান করার মধ্যে আলাদা মর্যাদা ও তাৎপর্য আছে। জীবন উৎসর্গ করতে নরক বা স্বর্গে যাওয়ার বিষয়টি মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। সাপের কামড়ে মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যুটা বিলাসীর কাছে আকস্মিক ও বেদনাদায়ক। কেননা দুজন দুজনকে গভীরভাবে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল। বাড়ি ও বাগান ছেড়ে জঙ্গলে এসে সুখের সংসার পেতেছিল। সেই গভীর সব স্মৃতিই তাকে মৃত্যুঞ্জয়ের পথ অনুসরণ করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। গ্রামের স্বার্থপর ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন লোকেরা যতই এটিকে অন্নপাপের ফল বলুক ন্যাড়া জানে তা মিথ্যা। আর সত্য হলো মৃত্যুঞ্জয়কে ছাড়া বিলাসী মূল্যহীন। এ মূল্যহীন জীবন সে ভালোবাসার জন্যই উৎসর্গ করেছে। তাই এ রকম একটা নরকে যাওয়ার সুযোগ পেলে ন্যাড়াও পিছু হটবে না, বরং নিজেকে ধন্য মনে করবে।

 

“টিকিয়া থাকাই চরম সার্থকতা নয়, এবং অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে।”

মানুষ স্বাভাবিকভাবেই পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। তারপর চিন্তা করে কীভাবে কতটুকু নিয়ে সে টিকে থাকবে এবং তা কতটুকু মর্যাদাপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ হবে। একসময় সারা পৃথিবীতে তোলপাড় করে বেড়াত বর্তমান কালের হাতির চেয়ে বিরাট আকারের হাতি (ম্যামথ), কিন্তু টিকে থাকতে পারেনি, এই প্রজাতির হাতি লুপ্ত হয়ে গেছে। অথচ আদিকাল থেকে ক্ষুদ্র অবয়ব নিয়ে তেলাপোকা টিকে আছে। যেমন টিকে আছে একসময়ের প্রবল প্রতাপান্বিত হিন্দু সমাজ তার অস্তিত্বটুকু নিয়ে। অথচ যাবতীয় কুসংস্কার ও জাত-পাতের গণ্ডি ভেঙে ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে নিজেদের বিশ্ব-উপযোগী করে গড়ে তুলতে পারে অনায়াসেই।

সাহিত্যের রূপ ও রীতি প্রবন্ধের সৃজনশীল প্রশ্ন