বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন প্রবন্ধের পাঠ বিশ্লেষণ

Table of Contents

বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন প্রবন্ধের পাঠ বিশ্লেষণ

“যশের জন্য লিখিবেন না।”

উৎকৃষ্ট সাহিত্যে রচনার উদ্দেশ্য সৌন্দর্য সৃষ্টি। কিন্তু লেখক যদি সেই রচনার মধ্য দিয়ে যশ বা খ্যাতি অর্জন করতে চান তবে রচনার মান ভালো হবে না। লেখা ভালো হলে যশ এমনিই আসবে। তাই যশ লাভের উদ্দেশ্যে সাহিত্য রচনা না করাই উত্তম।

 

“অর্থের উদ্দেশ্যে লিখিতে গেলে, লোকরঞ্জন-প্রবৃত্তি প্রবল হইয়া পড়ে।”

টাকা বা অর্থ লাভের জন্য সাহিত্য রচনা উচিত নয়। বিদেশে বিশেষ করে ইউরোপে অনেক লোেক এখন টাকার জন্য লেখে। তারা টাকাও পায়, লেখাও ভালো হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এখনও তা প্রচলিত নয়। অর্থের উদ্দেশ্যে লিখতে গেলে পাঠকের রুচি ও পছন্দের দিকটিকে গুরুত্ব দিতে হয়। এতে লোকের মনোরঞ্জন-প্রবৃত্তি প্রবল হয়, যার ফলে রচনা বিকৃত ও অনিষ্টকর হয়ে পড়ে।

 

“যাঁহারা অন্য উদ্দেশ্যে লেখেন, তাঁহাদিগকে যাত্রাওয়ালা প্রভৃতি নীচ ব্যবসায়ীদিগের সঙ্গে গণ্য করা যাইতে পারে।”

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতে, লেখক যদি বুঝতে পারেন যে তিনি লিখলে দেশ ও মানবজাতির কল্যাণ হবে তবে তিনি অবশ্যই লিখবেন। অথবা সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে পারলেও লিখবেন। কিন্তু যদি অর্থ উপার্জন বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে লেখেন তবে লেখক যাত্রাওয়ালা প্রভৃতি নীচ ব্যবসায়ীর সঙ্গে তুলনীয় হবেন।

 

“অন্য উদ্দেশ্যে লেখনী-ধারণ মহাপাপ।”

লেখার উদ্দেশ্য সৌন্দর্য সৃষ্টি বা মানবজাতির কল্যাণ। যা অসত্য বা ধর্মবিরুদ্ধ তা লেখা উচিত নয়। প্রবন্ধে অন্যকে কষ্ট দেয় বা নিজের স্বার্থের জন্য কোনো কিছু লেখা অনুচিত। সত্য ও ধর্মই সাহিত্যের উদ্দেশ্য। অন্য উদ্দেশ্যে। সাহিত্য রচনা মহাপাপ।

 

“যাহা লিখিবেন, তাহা হঠাৎ ছাপাইবেন না।”

লেখকমাত্রই নিজের লেখা ছাপার অক্ষরে দেখতে ভালোবাসেন। কিন্তু প্রাবন্ধিকের মতে, লেখা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ছাপানো উচিত নয়। তা কিছু সময় ফেলে রেখে সংশোধন করা উচিত। এতে রচনার উৎকর্ষ সাধিত হয়। রচনার দোষগুলো কেটে যায়। সাময়িক সাহিত্যের ক্ষেত্রে এ নিয়মটি রক্ষা করা হয় না। তাই সাময়িক সাহিত্য লেখকের পক্ষে ক্ষতিকর। কারণ ছাপা হয়ে গেলে আর সংশোধনের সুযোগ থাকে না।

 

“বিদ্যা থাকিলে, তাহা আপনিই প্রকাশ পায়, চেষ্টা করিতে হয় না।”

আমাদের সমাজে একশ্রেণির লেখক আছেন যারা তাদের লেখার মধ্য দিয়ে বিদ্যা জাহির করতে তৎপর হন। কিন্তু বিদ্যা প্রকাশের চেষ্টা করলে সেই সাহিত্য পাঠকের কাছে বিরক্তির কারণ হয়ে ওঠে। লেখকের বিদ্যা বা প্রতিভা থাকলে তা আপনা-আপনিই রচনায় প্রকাশ পাবে।

 

“অসময়ে বা শূন্য ভাণ্ডারে অলংকার প্রয়োগের বা রসিকতার চেষ্টার মতো কদর্য আর কিছুই নাই।”

অলংকার সাহিত্যের সৌন্দর্য সৃষ্টি করে। সাহিত্যের রস বা নির্যাস অনেকাংশেই অলংকারের ওপর নির্ভরশীল। তবে তা অবশ্যই যথাস্থানে। অযথা যেখানে সেখানে উপমা, অলংকার বা রসিকতা করলে সাহিত্য সৌন্দর্যের বদলে আরও কুৎসিত হয়ে উঠবে। আর অলংকার প্রয়োগ বা রসিকতা ব্যবহারের জন্য জোর করে চেষ্টা করা যাবে না। লেখকের ভাণ্ডারে তা থাকলে আপনা-আপনিই আসবে। না থাকলে মাথা কুটে মরে গেলেও আসবে না।

 

“সকল অলংকারের শ্রেষ্ঠ অলংকার সরলতা।”

সাহিত্যের সবচেয়ে বড় গুণ হলো প্রাঞ্জলতা বা সরলতা। সোজা ও সহজ ভাষায় মনের ভাব পাঠককে বোঝাতে হবে। যে লেখক সহজ ভাষায় পাঠকের কাছে তাঁর সৃষ্টি তুলে ধরতে পারবেন তিনিই শ্রেষ্ঠ লেখক।

 

“অনুকরণে দোষগুলি অনুকৃত হয়, গুণগুলি হয় না।”

অনেক লেখক আছেন যারা অন্য লেখক দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাকে অনুকরণ করে সাহিত্য রচনায় সচেষ্ট হন। কিন্তু এ রকম অনুকরণপ্রিয়তা সাহিত্যের জন্য ক্ষতিকর। লেখক কারও দ্বারা অনুপ্রাণিত হতে পারেন, তবে অনুকরণ করলে বেশিরভাগ সময় দোষগুলিই অনুকৃত হয়, গুণগুলো নয়।

বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন প্রবন্ধের পাঠ বিশ্লেষণ

বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন রচনার বক্তব্য বিষয়ঃ-

প্রবন্ধটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি উপদেশমূলক প্রবন্ধ। বক্তব্যের তাৎপর্যনবিচার করলে প্রবন্ধটির রয়েছে সর্বকালীন বৈশ্বিক আবেদন।এ প্রবন্ধে তিনি বাংলার নতুন লেখকদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর এ পরামর্শের মূলে ছিল বাংলা সাহিত্যের উন্নতি বিধান। তিনি নতুন লেখকদেরকে দেশ ও জাতির কল্যাণের জন্য লেখনী ধারণ করতে বলেছেন। অর্থ ও খ্যাতির জন্য না লিখে সৌন্দর্য সৃষ্টি করে মানুষকে আনন্দদানের জন্য লিখতে বলেছেন। আর সেই লেখা যেন সত্য ও ধর্মের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ না করে। কারণ সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য সত্য ও ধর্ম। এর অন্যথা করা পাপের কাজ। নতুন লেখকরা যেন লেখার প্রতি আন্তরিক হন। পরনিন্দা বা পরপীড়ন বা স্বার্থের বশে যেমন তেমন লেখা যেন না লেখেন। আর যা লিখবেন, তারা যেন তা তখনই না ছাপান। কিছুদিন রেখে বন্ধুদের পড়ে শুনিয়ে, তাদের মতামত নিয়ে সংশোধন করে পরে ছাপাতে দেন।লেখার ক্ষেত্রে তারা যেন কাউকে অনুকরণ বা অনুসরণ না করেন। নিজের ক্ষমতার বাইরে গিয়ে যেন কিছু সৃষ্টি করার দুঃসাহস না করেন। কারণ তাতে শক্তির অপচয় ঘটে যত, কাজ তত হয় না। তিনি নব্য লেখকদের দেশের সাধারণ পাঠকের রুচি ও শিক্ষা বিবেচনা করে লোকরঞ্জনের জন্য লিখতে বারণ করেছেন। তাতে রচনার মান নষ্ট হয়, বৃহত্তর কল্যাণ সাধন ব্যর্থ হয়। লেখার ক্ষেত্রে পাঠকের বোঝার উপযোগী সহজ-সরল ভাষা ব্যবহার করতে বলেছেন।কেউ যেন অযথা অপ্রয়োজনীয় অলংকার, অন্য ভাষার শব্দ ব্যবহার না করেন এবং নিজে বোঝেন না এমন ভাষা প্রয়োগ না করেন সেই বিষয়ে তিনি নব্য লেখকদের সতর্ক করেছেন। কারণ এ ধরনের বিদ্যা প্রকাশ করতে গিয়ে বেশিরভাগ লেখাই রুচিহীন এবং দুর্বল হয়ে পড়ে, যা উন্নত সাহিত্য সৃষ্টির অন্তরায়।তাই তিনি বাংলার নব্য লেখকদের এ বিষয়ে যত্নবান হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা যেন কারও অনুকরণ করতে গিয়ে তার দোষগুলো অনুকৃত না করেন। ভাষা প্রয়োগে নিজের ভাণ্ডারে যা আছে তা-ই ব্যবহার করেন। অযথা ইংরেজি, সংস্কৃত বা অন্য কোনো বিদেশি ভাষার শব্দ, কোটেশন ব্যবহার করে রচনাকে জটিল করে না তোলেন।পাঠককে সহজ-সরল ভাষায় তার লেখার মূল উদ্দেশ্য যেন বুঝিয়ে দেন। তারা যেন মনে রাখেন যে, সকল অলংকারের শ্রেষ্ঠ অলংকার সরলতা। আর এসব নিয়ম মেনে সাহিত্য সৃষ্টি হলে বাংলা সাহিত্যের দ্রুত উন্নতি সম্ভব।

অপরিচিতা গল্পের পাঠ বিশ্লেষণ করো?